নিজস্ব প্রতিবেদক : 


শহুরে ব্যস্ততা আর প্রতিদিনের যান্ত্রিকতার ভিড়ে মন যখন একটু মুক্তির স্বাদ চায়, তখন ঘরের কাছের প্রকৃতি আর জনপদই হতে পারে সেরা গন্তব্য। বেশ কয়েকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল কোথাও একটু ঘুরে আসি। ভাবলাম, দূরে কোথাও না গিয়ে নিজের আপন আঙিনা বিশ্বনাথ উপজেলার অজানা সৌন্দর্য আর জনপদগুলোই একবার দেখে আসি। যেই ভাবা সেই কাজ। আমার এই ইচ্ছার কথা বিশ্বনাথ উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ শাহিন উদ্দিন ভাইকে জানাতেই তিনি সানন্দে রাজি হলেন। ঠিক হলো রবিবার (১০ মে) সকালে আমরা বের হবো।


​সকাল ১০টা। বিশ্বনাথ প্রবাসী চত্বর থেকে দবির মিয়ার অটোরিকশায় চড়ে বসলাম আমি, শাহিন ভাই এবং আমাদের সাংগঠনিক সম্পাদক শ্রী অজিত চন্দ্র দেব। আমাদের গন্তব্য খাজাঞ্চি ইউনিয়ন। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই বাগড়া দিল রাস্তা। এই অঞ্চলের রাস্তার বেহাল দশা আর ভাঙাচোরা অবস্থা দেখে কিছুটা মন খারাপ হলো, তবে চারপাশের সবুজ প্রকৃতি সেই বিষণ্নতা কাটিয়ে দিচ্ছিল। ভোলাগঞ্জ বাজারে পৌঁছালে আমাদের সাথে যুক্ত হলেন ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ আব্দুল কাইয়ুম।


​বেলা ঠিক ১১টা ২৫ মিনিটে আমরা পৌঁছালাম খাজাঞ্চি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের পাকিছিরি গ্রামে, ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সায়েস্তা মিয়ার বাড়িতে। সেখানে চা-নাস্তার আপ্যায়ন শেষে আমরা বেরিয়ে পড়লাম এই জনপদের শিক্ষার হালচাল দেখতে।

​দুপুর ১২টায় আমরা খাজাঞ্চিগাঁও এস এ খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাই। এরপর আমাদের গন্তব্য ছিল খাজাঞ্চিগাঁও মালিকা খাঁনম হাফিজিয়া দাখিল মাদ্রাসা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটিতে উপস্থিত হয়ে আমরা শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময় করি। প্রান্তিক পর্যায়ের এই জনপদে শিক্ষার আলো ছড়াতে প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করছে, তা শিক্ষকদের মুখে শুনে অভিভূত হলাম।


​শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম লামাকাজী ইউনিয়নের হাজারিগাঁও গ্রামে। সেখানে কবি ও ছড়াকার লাহিন নাহিয়ানের বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাৎ করি। লাহিন ভাইয়ের আতিথেয়তা আর গাছের পাকা কাঁঠালের স্বাদ ছিল এই ভ্রমণের অন্যতম এক স্মৃতি। এরপর পুনরায় সায়েস্তা ভাইয়ের বাড়িতে ফিরে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিই।

​খাওয়া-দাওয়ার পর যখন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখনই আকাশ ভেঙে নামল বৃষ্টির ফোঁটা। বৃষ্টির বেগ একটু কমলে শাহিন ভাই, সায়েস্তা ভাই, অজিত দাদা, কাইয়ুম ভাইসহ আমি রওনা হলাম চন্দ্রগ্রামের দিকে। সেখানে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল প্রায় শত বছরের পুরনো 'রাজ রাজেশ্বর মন্দির' দেখা।


​মন্দিরের কারুকার্য আর প্রাচীন স্থাপত্যের ছাপ আমাদের মুগ্ধ করল। স্থানীয়দের কাছে জানলাম এই মন্দিরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। বৃষ্টির ভেজা দুপুরে শতবর্ষী এই মন্দিরের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আমাদের জনপদে কত ইতিহাস আর ঐতিহ্য নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, যা হয়তো অনেকের কাছেই অজানা।

​বিকেলের নাস্তা সারলাম হামদরচক গ্রামে আব্দুল কাইয়ুম ভাইয়ের বাড়িতে। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই সায়েস্তা ভাই ও কাইয়ুম ভাইকে ভোলাগঞ্জ বাজারে বিদায় জানিয়ে আমরা বিশ্বনাথের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ফেরার পথে রামপাশা বাজারে ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক আলতাব হোসেনের দোকানে আড্ডা আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে মেতে উঠলাম আমি, শাহিন ভাই ও অজিত দাদা।


​অবশেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমরা যখন বিশ্বনাথে পৌঁছালাম, তখন বৃষ্টির রেশটা কাটলেও মনের ভেতর খাজাঞ্চির সেই ভাঙা রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঘ্রাণ আর রাজ রাজেশ্বর মন্দিরের স্মৃতিগুলো ছিল তরতাজা। নিজের উপজেলাকে জানার এই যাত্রাটি ছিল যেমন আনন্দের, তেমনি শিক্ষার।